রবিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২১, ০২:১৪ পূর্বাহ্ন

খর স্রোতা পূর্ণভবা নদীর বুকজুড়ে ধান চাষ!

ছবি : সংগৃহীত

সুলতান মাহমুদ চৌধুরী, দিনাজপুর : পূর্ণভবা নদীর তীরে দিনাজপুর শহর অবস্থিত । পূর্ণভবা নদীতে বার মাস পানি থৈ থৈ করত । নদী পথে অনেক বনিকেরা ব্যবসা করার জন্য দিনাজপুর শহরে আসত। দিনাজপুর শহরের পূর্ণভবা নদীর কোল ঘেসে দিনাজপুর জেলার বুক চিরে প্রবাহিত পূনর্ভবা নদীর উপর দিয়ে একসময় ছুটে চলত বড় বড় নৌকার বহর। সারা বছর নদীতে মাছ ধরে অনেক জেলে পরিবার জীবন জীবিকা নির্বাহ করত । এখন সেই কথা রুপ কথা মত মনে হয় । এখন বর্ষা মৌসুমে পূর্ণভবা নদীতে থাকলেও সারা বছর আর নদীতে পানি সন্ধান পাওয়া যায় না । তাই ষাট-এর দশকের ভাটিয়ালী গানের সুরে পাল তোলা নৌকা নিয়ে ছুটে চলা ভরা যৌবনা উত্তাল পূর্ণভবা নদীর বুকে এখন দোল খাচ্ছে সবুজ ধানক্ষেত। খুব বেশি আগের কথা নয়। ষাট-এর দশক জুড়েই ভরা যৌবনা ছিল পূনর্ভবা নদী।

আশির দশক থেকে ক্রমেই যৌবন হারাতে থাকে এ নদী। এখন এসে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে নদীটির আর হারানোর কিছুই নেই। সেই অতীতে পূনর্ভবা নদীতে ঢেউয়ের তালে তালে চলাচল করতো অসংখ্য নৌকা। ভাটিয়ালী আর পল­ীগীতি গানের সুরে মাঝিরা নৌকা নিয়ে ছুটে চলতো কেন্দ্রিক ব্যবসা কেন্দ্রগুলোতে।

এ নদীকে ঘিরে বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা বড় বড় হাটবাজার সমূহে ব্যবসার জন্য ধান, পাট, আলু, বেগুন, সরিষা, কালাই ও গমসহ নান কৃষিপণ্য নিয়ে সওদাগররা নৌকার পাল তুলে মাঝিরা ছুটে চলতেন। অসংখ্য মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবন জীবিকার রাস্তা খুঁজে পেয়েছিল। নদীর পানি দিয়ে কৃষক দুই পাড়ের উর্বরা জমিতে ফসল ফলাতো। সে এক নয়নাভিরাম দৃশ্য।

জীবিকার সন্ধানে নদী সংলগ্ন ও আশপাশ এলাকার অসংখ্য জেলে পরিবারের বসতি গড়ে উঠেছিল। ছোট বড় নানা প্রজাতির মাছের অফুরন্ত উৎস ছিল এ নদী। মাছ পাওয়া যেত সারা বছর। জীবিকার জন্য মাছের আশায় জেলেরা রাতদিন ডিঙ্গি নৌকায় জাল-দড়ি নিয়ে চোষে বেড়াতেন নদীর এ প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। ধরা পড়তো প্রচুর মাছ। সেই সোনালি দিন শেষে হয়ে গেছে অনেক আগেই।

সময় গড়িয়ে চলার সাথে সাথে সেই ভরা যৌবনা পূর্ণভবা নদী এখন মরাখালে পরিণত হওয়ায় পূর্ণভবা কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অসংখ্য হাটবাজার এখন হয়েছে বিরাণ অঞ্চল, কৃষি জমিগুলো পরিণত হয়েছে ধূ ধূ প্রান্তরে, জেলে পরিবারগুলো হয়ে গেছে বিলীন আর সে সময়ের ব্যবসা-বাণিজ্যের উৎসগুলো হয়ে গেছে প্রায় বন্ধ। এসবই এখন কালের সাক্ষী।

ঐতিহ্যের দিক থেকে এ জেলার নদ-নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল পূর্ণভবা নদী। ভৌগোলিকভাবে নদীটি ছিল চমৎকার অবস্থানে। নদীটি কোনদিন খনন ও ড্রেজিং করা হয়নি এমনকি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তেমন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সরকারের নজর না দেয়ার সুযোগে এক শ্রেণির দখলবাজ নদীটির অনেক স্থান দখলে নিয়ে খুশিমত ভরাট করে ফেলেছে। কেউ কেউ বর্জ্য ফেলে দূষণ ও ভরাট অব্যাহত রেখেছে। অনেকে অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র থেকে বালু উত্তোলন ও পাড় কেটে মাটি বিক্রির প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে।

চক কাঞ্চন গ্রামের রফিকুল ইসলাম জানায়, পূর্ণভবা নদীর পারেই আমাদের পৈত্রিক বাড়ী। ছোট বেলায় দেখতাম বাবার সাথে নদীতে গোসল করতে যেতাম । নদীতে হাত দিয়ে মাছ ধরা যেত বাবা অনেক বছর হল পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছেন। আমারও বয়স হয়েছে । আবাদি জমি নেই বললেই চলে তাই নদীতে চড় পড়ে আছেন এমন জায়গায় গত ১০ বছর ধরে ইরি মৌসুমে ধান চাষ করি যা দিয়ে সারা বছরের চালের ব্যবস্থা হয়ে যায় । কিছু ধান বিক্রিও করা যায়।

একই গ্রামে চান মিয়া বলেন, প্রত্যেক বছর পূর্ণভবায় ইরি ধান আবাদ করি । ইরি ধান প্রায় পাকার দিকে চলে আসছে । শ্যালো মেশিন দিয়ে সেই ইরি ধানের ক্ষেতে পানি দিতে হয় । তেমন বেশি সার দিতে হয় না জমিতে। তবে ধানের আবাদ অনেক ভাল হয । প্রতি শতকে প্রায় ২ থেকে ৩ মন পর্যন্ত ধান হয এই জমিতে । তবে আমাদের এই নদী ভরাট হতে পারে তাই ধান কাটা নিয়ে দুচিন্তায় আছি ।

দিনাজপুর নদী বাঁচাও আন্দোলন কমিটির সভাপতি শাহাদাৎ শাহ জানান, দিনাজপুর জেলায় ছোট বড় প্রায় ১৯টি মত নদী আছে । তার বেশির ভাগ নদীগুলিতে পানি নেই । নদীগুলিতে পানি না থাকার কারন হল পানির স্তর আস্তে আস্তে অনেক দুরে চলে গেছে । দ্বিতীয়ত দিনাজপুরের উজান থেকে পানি প্রবাহিত হয় না । তৃতীয়ত বেশির ভাগ নদীগুলি ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি থাকে না । নদী পাড়ের মানুষগুলি নদী দখলে ব্যস্ত ফলে যে যার মত করে নদী পার ভরাট দোকানপাট বাসা বাড়ী তৈরী করছে।বিশেষ করে সুবিধাবাদি স্বার্থান্বেষী এক শ্রেণীর দালাল, সব সময় ক্ষমতাসীন দলের মুকুট পরিহিত ব্যাক্তিরা এই নদী দখল, বালু উত্তেদালন, নদীতে বজ্য ফেলা এ সকল কাজের সাথে জড়িত ।

দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড নিবাহী প্রকৌশলী ফইজুর রহমান জানান আত্রই, ঢেপা, পূর্ণভবা, ছোট যমুনা , করতোয়া, ইছামতি, বেলান, ভেলামতি, কাকড়া, গভেশ্বরী, ভুল্লী, পাথরঘাটা, নর্ত, ছোট ঢেপা, তুলশীগঙ্গা , চিরি, তুলাই ,মাইলা, নলশিশা এই ১৯টি নদীর দীর্ঘ প্রায় ৭শত কিলোমিটার । এই জেলায় ৬৫টি বিল আর ৭৪টি জলাশয় রয়েছে । এখন বেশির ভাগ বিল, জলাশয় শুকনো । তবে আশার খবর হল এই জেলার ১৩ টি উপজেলার ১৪টি খাল পূর্ণঃখননের জন্য দরপত্র আহবান করা হয়েছে । ইতোমধ্যে কয়েকটি খাল পূর্ণঃখননের কাজ শুরু হয়েছে ।

দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মাহমুদুল আলম জানায় দিনাজপুর ৩শত ৪৭ জন নদী, খাল, বিল, ও জলাশয় দখলদারের নামের তালিকা তৈরী করা হয়েছে । দিনাজপুরের অনানুষ্ঠানিক ভাবে নদী দখল মুক্ত করা কাজ শুরু হয়েছে । স্বল্প সময়ের মধ্যে নদী, খাল, বিল দখলকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে। সরকার প্রধানের নির্দেশনা মোতাবেক কোন নদী, খাল, বিল দখলকারীকে ছাড়া দেওয়া হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন ।

বিডি নিউজ ৭১/ইমানুর রহমান

নিউজটি শেয়ার করুন...

আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...


© All rights reserved © 2018 bdnews71
Design & Developed by M Host BD